মুমিনগণের জীবনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

0

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’য়ালার জন্য যিনি রব্বুল আলামীন। দুরুদ ও সালাম রসূলুল্লাহ্ সল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি যিনি রহমাতুল্লিল আলামীন, তাঁর পরিবারবর্গ, সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং সালেহীন (রহমাতুল্লাহি আলাইহিম)-গণের প্রতি। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই। আমরা আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর বান্দাহ ও রসূল। নিশ্চয়ই শুভ পরিণতি শুধুমাত্র মুত্তাকীনদের জন্যই নির্ধারিত।

মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিসসালাম এর আদি নিবাস হল জান্নাত। তাই মুমীনগণের জীবনের চুড়ান্ত লক্ষ্য হল আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাত লাভ করা। আল্লাহ তা’য়ালা স্বয়ং মানব জাতিকে তাঁর পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসংগে মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন : “আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।” -[সূরা আলে-ইমরানঃ ১৩৩]

প্রভুর পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাত লাভের সর্বপ্রথম শর্ত হল বিশুদ্ধ ঈমান। আর বিশুদ্ধ ঈমান অবশ্যই সকল প্রকার শিরক, কুফর, নিফাক, তাগুত ও জাহালাত মুক্ত হতে হবে। এ-হচ্ছে আল্লাহ্ তা’য়ালার বিশেষ অনুগ্রহ। এ প্রসংগে তিনি বলেন : “তোমরা তোমাদের মালিকের পক্ষ থেকে সেই (প্রতিশ্রুত) ক্ষমা ও চিরন্তন জান্নাত পাওয়ার জন্যে ধাবিত হও (এমন জান্নাত) যার আয়তন আসমান-যমীনের সমান প্রশস্ত তা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে সেসব মানুষদের জন্যে যারা আল্লাহ্ তায়ালা ও তার (পাঠানো) রসূলদের ওপর ঈমান এনেছে, (মূলত) এ-হচ্ছে আল্লাহ্ তায়ালার এক অনুগ্রহ, যাকে তিনি চান তাকেই তিনি এ অনুগ্রহ প্রদান করেন; আর আল্লাহ্ তায়ালা হচ্ছেন মহা অনুগ্রহশীল।” -(সূরা-আল হাদীদঃ আয়াত ২১)

প্রভুর পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাত লাভের সর্বপ্রথম শর্ত হল বিশুদ্ধ সালাত। সালাত মুমীনগণের প্রকৃত ঈমানকে সত্যায়ন করে এবং তাদেরকে সুমহান মর্যাদা, মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে ধাবিত করে। এ প্রসংগে মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন : “নিশ্চয়ই মু’মিন তারা, আল্লাহর নাম উচ্চারিত হলে যাদের হৃদয় বিগলিত হয়ে চমকে ওঠে, যখন তাদের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তাদের ঈমানকে সুদৃঢ় করে আর তারা কেবলমাত্র তাদের প্রভুর উপরেই ভরসা রাখে। যারা সালাত কায়েম করে এবং আমি যে জীবিকা তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে- তারাই সত্যিকারের মুমিন। তাদের প্রভুর নিকট তাদের জন্য রয়েছে মর্যাদা, ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।” -(সূরা আনফালঃ আয়াত ২-৪)

তিনি আরও বলেন : “নিশ্চয়ই মুসলমান পুরুষ, মুসলমান নারী, ঈমানদার পুরুষ, ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ, অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ, সত্যবাদী নারী, ধৈর্য্যশীল পুরুষ, ধৈর্য্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ, বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ, দানশীল নারী, রোযা পালণকারী পুরুষ, রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী পুরুষ, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী নারী, আল্লাহর অধিক যিকরকারী পুরুষ ও যিকরকারী নারী-তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরষ্কার।” -[সূরা আল-আহযাবঃ ৩৫ ]

একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সাথে সালাতের হেফাজত জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী করেঃ এ প্রসংগে মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন : “অবশ্যই (ঐ সব) মু’মিনগণ সফল হয়েছে। যারা তাদের সালাতে সমর্পিত প্রাণ, বিনয়ী ও নিষ্ঠাবান হয়। যারা বাজে কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকে। যারা তাদের যাবতীয় কার্যক্রম পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে। যারা নিজেদের গুপ্তাঙ্গ হিফাযত করে তবে তাদের স্ত্রীদের এবং অধিকারভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে কোন দোষ নেই। যারা এ সীমা লংঘন করবে, তারাই হল সীমালংঘনকারী। যারা নিজেদের আমানত রক্ষা করে এবং ওয়াদা পূরণ করে। যারা নিজেদের সালাতের হিফাযত করে। তারাই হল সে সকল লোক, যারা উত্তরাধিকারী হবে। উত্তরাধিকারী হবে জান্নাতুল ফিরদাউসের। সেখানে তারা চিরদিন থাকবে।” -(সূরা মুমিনুনঃ আয়াত ১-১১)

উদাসীন মন ও লোক দেখানো সালাত জাহান্নামের অধিবাসী হওয়ার কারণ হবেঃ এ প্রসংগে মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন : “অতঃপর ধ্বংস সেই সব সালাত আদায়কারীর জন্য-যারা তাদের সালাতের ক্ষেত্রে উদাসীন এবং যারা লোক দেখানোর জন্য সালাত আদায় করে” –(সূরা মাঊনঃ আয়াত ৪-৬)

সালাতের আদব, গুরুত্ব ও ফজিলত প্রসংগে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস গন্থসমূহে বহু বর্ণনা লিপিবদ্ধ রয়েছে। তার ভিতর থেকে বর্তমান প্রবন্ধে নমুনা স্বরূপ কতিপয় আয়াত ও হাদীস সকলের গভীর উপলব্ধি, বিবেচনা ও আমলের জন্য তুলে ধরা হল।

পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাতের প্রতি যত্নবান হতে হবেঃ মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন : “সমস্ত সালাতের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের ব্যাপারে। আর আল্লাহর সামনে একান্ত আদবের সাথে দাঁড়াও।” -[সূরা বাকারাহঃ আয়াত ২৩৮]

তিনি আরও বলেনঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা রূকু কর সিজদা কর তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত কর এবার সৎকাজ সম্পাদন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার । তোমরা আল্লাহর জন্য শ্রম স্বীকার করো যেভাবে শ্রম স্বীকার করা উচিত।” -(সুরা হজ্বঃ আয়াত ৭৭-৭৮)

সালাত অশ্লীলতা ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখেঃ মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন : “নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীলতা ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে, আর আল্লাহর যিকির (স্মরণ) হল সবচাইতে বড়, এবং তোমরা যা কর সে সম্পর্কে তিনি জ্ঞান রাখেন।” -(সূরা আনকাবুতঃ আয়াত ৪৫)

ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনাঃ আর তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। অবশ্যই তা কঠিন কিন্তু বিনীতগণের জন্যে নয়। যারা ধারণা করে যে নিশ্চয় তারা তাদের প্রতিপালকের সাথে মিলিত হবে এবং তারা তারই দিকে প্রতিগমন করবে। (সুরা বাকারাহঃ আয়াত ৪৫-৪৬)

সালাত হল মুমিনের অঙ্গীকারঃ হযরত বুয়ায়দা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : আমাদের ও তাদের মধ্যে যে অঙ্গীকার রয়েছে তাহল নামায, সুতরাং যে নামায ত্যাগ করে সে কাফের হয়ে যাবে । ( আহমদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ)

সালাত হল ঈমানের সাক্ষ্যঃ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যখন তোমরা কাউকে অধিক পরিমাণে মসজিদে আসতে অভ্যস্ত দেখ তাহলে তার ঈমানদার হওয়ার সাক্ষ্য দাও। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেনঃ “মসজিদসমূহকে ঐ সমস্ত লোকেরাই আবাদ করে, যারা আল্লাহ তাআলা ও আখেরাতের দিনের উপর ঈমান রাখে। – {সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-৩০৯৩, সুনানে দারেমী, হাদীস নং-১২২৩, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-১৭২১, সহীহ ইবনে খুজাইমা, হাদীস নং- ১৫০২, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১১৬৫১, মুসনাদে আব্দ বিন হুমাইদ, হাদীস নং-৯২৩}

পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে জান্নাতের অংগীকারঃ হযরত ওবাদা ইবন সামেত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “আল্লাহ বান্দাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি সালাতসমূহের হকে কোন প্রকার কমতি ও তাচ্ছিল্য না করে সঠিকভাবে সেগুলো আদায় করে, তার জন্য আল্লাহর এ অঙ্গিকার যে, তিনি তাকে জান্নাত দান করবেন। আর যে এগুলোর ব্যাপারে কমতি ও তাচ্ছিল্য করে তা আদায় করবে, তার প্রতি আল্লাহর কোন অঙ্গিকার নেই। তিনি চাইলে তাকে শাস্তিও দিতে পারেন, আবার ক্ষমাও করতে পারেন’’। -[হাদীসটি মোয়াত্তায়ে মালিক, মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে]

অনুরূপ বর্ণনাঃ হযরত আবু ক্বাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, নিশ্চয় আমি আপনার উম্মতের উপর পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয করেছি এবং আমার কাছে একটি অঙ্গীকার রেখেছি যে, যে ব্যক্তি ওয়াক্তমত সেই পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করে ক্বিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে আমি তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করাব। আর যে ব্যক্তি সেগুলোর সংরক্ষণ করবে না তার জন্য আমার নিকট কোন অঙ্গীকার নেই’। -(আবু দাঊদঃ হাদীস নং ৪৩০)

অনুরূপ বর্ণনাঃ হযরত হানযালা রাদ্বিয়াল্লা-হু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সঠিকভাবে আদায় করবে, অর্থাৎ রুকু- সেজদা ইত্যাদি যথাযথভাবে আদায় করবে ও যথাসময়ে (জামায়াতে) পড়বে, আর এরকম অটল বিশ্বাস রাখবে যে, নামায আল্লাহ্‌ তা’আলার সত্য হুকুম, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব এবং জাহান্নাম হারাম হয়ে যাবে।”

-{মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং-১৭৮৮১,১৭৯৭৫, তারিখে দামেশক, হাদিস নং-২০৯৫, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদিস নং-১৫৯৮, মুসনাদ ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং-৮৩৫, মুজা’আম কাবীর, হাদিস নং-৩৪১৭, মুসনাদ আস-সামিয়ীন, হাদিস নং-১১৫১,শুয়াবুল ঈমান, হাদিস নং-২৫৭৯, ইত্তেহাফিল মুহরা, ইবনে হাজার, হাদিস নং-৪২২৮}

হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন গ্রাম্য লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল আপনি আমাকে এমন কিছু আমল বাতলে দিন, তার উপর আমল করে আমি যাতে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সাথে কাউকে শরিক করবে না, ফরয সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে এবং রমযান মাসের রোজা রাখবে। লোকটি বলল, ঐ সত্তার কসম যার হাতে মুহাম্মদের জীবন, আমি এর উপর কোনো কিছু কখনোই বাড়াবো না এবং কমাবো না। যখন লোকটি চলে যাচ্ছিল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যার মনে চায় কোন জান্নাতী লোক দেখতে তাহলে সে যেন এ লোকটির দিক তাকায়।” – [ বুখারীঃ ১৩৯৭ ও মুসলিমঃ ১৪]

ফজর ও আসরের সালাতের বিশেষ ফজিলতঃ হযরত আবু মূসা আশআ’রী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: অর্থাৎ ‘‘যে ব্যক্তি শীতল ওয়াক্তের দুই সালাত (ফজর -আসর) আদায় করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’’। [বুখারী ও মুসলিম]

একই বিষয়ঃ হযরত আবু বকর ইবন আবূ মূসা আল-আশআরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি দুইটি ঠাণ্ডার সালাত (আসর ও ফজর) আদায় করে সে জান্নাতি হবে। -[মুসলিম, পরিচ্ছেদ: ফাদলু সলাতিস সুবহি ওয়াল আসর]

একই বিষয়ঃ হযরত আবু যুহাইর উমারা ইবনে রুওয়াইবা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে নামায পড়ে সে কখনো জাহান্নামে যাবেনা। অর্থাৎ ফজর ও আসরের নামায। -[রিয়াদুস সালেহীনঃ হাদীস নং ১০৪৮; ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন]

আসরের বিশেষ গুরুত্বঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমার সামেত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যদি কোন ব্যক্তির ‘ আসরের সলাত ছুটে যায়, তাহলে যেন তার পরিবার-পরিজন ও মাল-সম্পদ সব কিছুই ধংস হয়ে গেল। -(বুখারীঃ হাদীস নং ৫৫২)

এশা ও ফজরের নামাযের ফজিলতঃ হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “এশার ও ফজরের নামাযের মত আর কোন নামায মুনাফিকদের কাছে বেশী ভারবহ মনে হয়-না। তবে যদি তাঁরা জানতো এই দুই নামাযের মধ্যে কি (ফজিলত) আছে, তাহলে তাঁরা হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নামাযে আসত।” – [বুখারী ও মুসলিম]

সালাতের ওয়াক্ত : হযরত বুরাইদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যাক্তি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে তাঁকে সালাতের ওয়াক্ত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তিনি বলেন: তুমি আমাদের সাথে এই দু দিন সালাত পড়ো। সূর্য ঢলে পড়লে তিনি বিলাল -কে আযান দেয়ার নির্দেশ দিলে তিনি আযান দেন। এরঃপর তিনি তাকে একামত দেয়ার নির্দেশ দেন এবং যোহরের সালাত পড়েন। এরপর তিনি তাকে আসরের সালাতের (আযান দেয়ার) নির্দেশ দেন এবং আসরের সালাত পড়েন এবং সূর্য তখন অনেক উপরে সাদা, পরিচ্ছন্ন ও উজ্জ্বল ছিল। এরপর সূর্য অস্ত গেলে তিনি তাঁকে মাগরিবের আযান দেয়ার নির্দেশ দেন এবং মাগরিবের সালাত পড়েন। অতঃপর পশ্চিম আকাশের লাল আভা (শাফাক) অদৃশ্য হওয়ার পর তাকে এশার সালাতের আযান দেয়ার নির্দেশ দেন এবং এশার সালাত পড়েন। অতঃপর ফজরের ওয়াক্ত হলে তিনি তাকে আযান দেয়ার নির্দেশ দেন এবং ফজরের সালাত পড়েন। দ্বিতীয় দিন তিনি বিলাল -কে আযানের নির্দেশ দিলে তিনি যোহরের আযান দেন এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলম্বে যোহরের সালাত পড়েন। অতঃপর তিনি আসরের সালাত পড়েন, যখন সূর্য উপরে ছিল ঠিকই, কিন্তু প্রথম দিনের তুলনায় একটু বেশি ঢলে পড়েছিল। অতঃপর তিনি পশ্চিম আকাশের শুভ্র আভা অদৃশ্য হওয়ার আগে মাগরিবের সালাত পড়েন। রাতের এক-তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হওয়ার পর তিনি এশার সালাত পড়েন। পূর্বাকাশ পরিষ্কার হওয়ার পর তিনি ফজরের সালাত পড়েন, অতঃপর বলেন: সালাতের ওয়াক্ত সম্পর্কে জিজ্ঞেসকারী কোথায়? লোকটি ললো, এই যে আমি, হে আল্লাহ্‌র রসূল! তিনি বলেন: তোমরা যেভাবে দেখতে পেলে তোমাদের সালাতের ওয়াক্তসমূহ তার মাঝখানে অবস্থিত। তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: মুসলিম ৬১১-২, তিরমিযী ১৫২, নাসায়ী ৫১৯, আহমাদ ২২৪৪৪। সহীহ আবূ দাউদ ৪২৩

গুনাহ মাফ এবং মর্যাদা বৃদ্ধির আমলঃ রহযরত আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কি তোমাদেরকে সে কাজের কথা বলে দিব না, যার দ্বারা আল্লাহ সুবহানা ওয়াতা’আলা তোমাদের গুনাহ মাফ করে দিবেন এবং তোমাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিবেন? সাহাবীগণ আরয করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ)! অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন : কষ্টের সময় অযু করা, মসজিদের দিকে বেশি বেশি হেটে যাওয়া এবং এক নামাজের পর এর পরবর্তি নামাজের অপেক্ষারত থাকা। – (সহীহ মুসলিমঃ হাদীস নং ১৩১)

বিদায়ী শুভেচ্ছা জ্ঞাপনকারী ব্যক্তির ন্যায় সলাত আদায়ঃ হযরত আবূ আইয়ূব আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন এক ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বলল,আমাকে সংক্ষেপে কিছু উপদেশ দিন। অতঃপর নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি যখন তোমার সলাতে দন্ডায়মান হও তখন বিদায়ী শুভেচ্ছা জ্ঞাপনকারী ব্যক্তির ন্যায় সলাত আদায় করবে এবং এমন কোন কথা বলবে না যার কারণে ভবিষ্যতে ক্ষমা চাইতে হয় এবং মানুষের দূরবস্থা দেখে তা থেকে হতাশাকে নিয়ন্ত্রণ রাখবে।
( হাদীসটি সহীহ, সহীহাহ্- হাঃ ৪০১)

সকাল-সন্ধ্যা মাসজিদে গমনের ফজিলতঃ হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি সকাল সন্ধ্যা মাসজিদে যায়, তার জন্য আল্লাহ সকাল বিকাল যখনই সে গমন করে জান্নাতের মধ্যে মেহমানদারীর ব্যবস্থা করেন’’। -[বুখারী ও মুসলিম]

একাধারে চল্লিশ দিন পর্যন্ত প্রথম তাকবীর সহ জামা‘আতের সাথে সালাত আদায়কারী জান্নাতি হবেঃ হযরত আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত তাকবীরে উলার সাথে জামা‘আতের সাথে আদায় করে তার জন্য দুইটি মুক্তি লেখা হয়। একটি জাহান্নাম থেকে আর অপরটি মুনাফেকি থেকে। -[তিরমিযি, হাদিস নং ১/২০০]

সময়মত সালাত আদায় বান্দার পাপরাশি বিলীন করে দেয়ঃ হযরত আবু যর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। একবার শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যাচ্ছিলো।এমন সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের বাহিরে এলেন এবং একটি গাছের দু’টি শাখা ধরে ঝাঁকি দিলেন। তখন ঝরঝর করে গাছের শুকনো পাতা পড়তে লাগলো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : হে আবু যর ! যখন কোনো মুমিন একনিষ্ঠভাবে আন্তরিকতার সাথে নামায পড়ে তখন তার পাপরাশি ঠিক এভাবে ঝরে পড়ে যেমন এ গাছের পাতাগুলো ঝরে পড়েছে। -[মুসনাদে আহমাদ]

হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি : “বলত যদি তোমাদের কারো বাড়ীর সামনে একটি নদী থাকে, আর সে তাতে প্রত্যহ পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার দেহে কোন ময়লা থাকবে?” তারা বললেন, তার দেহে কোনরূপ ময়লা বাকী থাকবে না। রাসূলুল্লাহ্(সা.) বললেনঃ এ হল পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের উদাহরণ। এর মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তা’আলা (বান্দার) গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন। -(সহিহ বুখারীঃ হাদিস-৫০৬)

হযরত আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “পাঁচ ওয়াক্তের সালাত, এক জুমুআ থেকে আরেক জুমুআ এবং এক রামাদান থেকে আরেক রামাদানের মধ্যবর্তী সব গুনাহ্ কে মুছে দেয়, যদি সে কবীরা গুনাহ্ থেকে বেঁচে থাকে।” -[মুসলিমঃ ৪৫৯]

হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “তিনটি জিনিস গুনাহ মাফ করে, তিনটি জিনিস মর্যাদা বৃদ্ধি করে, তিনটি জিনিস নাজাত দেয়, আর তিনটি জিনিস ধ্বংস করে। যে তিনটি জিনিস গুনাহ মাফ করে তা হচ্ছে – প্রচণ্ড শীতে নিখুঁতভাবে ওযু করা, এক সলাতের পর পরবর্তী সলাতের অপেক্ষায় থাকা এবং জামা’আতে গমন করা। যে তিনটি জিনিস মর্যাদা বৃদ্ধি করে তা হল : (ক্ষুধার্তকে) খাদ্য খাওয়ানো, বেশি বেশি সালামের প্রচলন এবং রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন সলাত আদায় করা। যে তিনটি জিনিস নাজাত দেয় তা হল – (ব্যক্তিগত) ক্রোধ বা সন্তুষ্টি উভয় অবস্থায় ন্যায় বিচার করা, দারিদ্র ও প্রাচুর্য উভয় অবস্থায় মধ্যম জীবন যাপন করা এবং গোপন ও প্রকাশ্য উভয় অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করা। আর যে তিনটি জিনিস ধ্বংস করে তা হল – কৃপণতার নীতি অনুসরণ করা, প্রবৃত্তির খেয়াল খুশি মত চলা এবং অহঙ্কার করা।” -[সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নাম্বার ৪৫০, হাদীসটি হাসান]

সালাতের মাঝে শয়তানের ওয়াসওয়াসাঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “নামাযের জন্য আযান দেওয়ার সময় শয়তান সশব্দে বায়ু ছাড়িতে ছাড়িতে পালায়, যেন সে আযানের শব্দ না শোনে। আযান শেষ হইলে সে আবার আসে। ইকামত আরম্ভ হইলে আবার পলায়ন করে। ইকামত বলা শেষ হইলে পূনরায় উপস্থিত হয় এবং ওয়াসওয়াসা ঢালিয়া নামাযী ব্যক্তি ও তাঁহার অভীষ্ট লক্ষ্যের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃস্টি করে। যে সকল বিষয় তাহার স্বরণ ছিল না সেই সবের প্রতি মনযোগ আকৃষ্ট করিয়া সে বলিতে থাকেঃ অমুক বিষয় স্বরণ কর, অমুক বিষয় স্বরণ কর। ফলে সেই ব্যাক্তি কত রাকাআত নামায পড়য়াছে এমনকি সেটাও ভুলিয়া যায়।” (বিঃদ্রঃ নামাযে ওয়াসওয়াসা প্রদাওনকারী শয়তানের নাম হচ্ছে “খানজাব”) -[মুয়াত্তা মালিকঃ হাদিস নং ১৫২]

অনুরূপ বর্ণনাঃ হযরত আবদুল্লাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই অভ্যাসগুলোর উপর আমলকারী কম হওয়ার কারণ কী? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, (কারণ এই যে) শয়তান নামাযের মধ্যে এসে বলে, অমুক প্রয়োজন বা অমুক কথা স্মরণ কর। অবশেষে তাকে বিভিন্ন খেয়ালে মশগুল করে দেয়, যেন এই কালেমাগুলো পড়ার কথা খেয়াল না থাকে। আর বিছানায় এসে তাকে ঘুম পাড়াতে থাকে। এইভাবে সে কালেমাগুলো না পড়েই ঘুমিয়ে পড়ে। -(সহীহ ইবনে হিববানঃ ২০১২; সুনানে আবু দাউদঃ ৫০৬৭ এবং জামে তিরমিযীঃ ৩৪১০)

নামাযে এদিক সেদিক তাকানো নিষিদ্ধঃ হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছি যে, নামাযে এদিক সেদিক তাকানোর ব্যাপারে আপনি কী বলেন? জবাবে তিনি বলেছেন, এটা হল শয়তানের ছোঁ মারা, যা দ্বারা শয়তান আল্লাহর বান্দাদেরকে নামায থেকে গাফেল ও উদাসীন করে ফেলে। -[সহীহ বুখারীঃ হাদীস নং ৭৫১]

নামাযে উপরের দিকে তাকানো নিষিদ্ধঃ হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ লোকদের কি হলো যে, তারা নামাযের মধ্যে উপরের দিকে তাকায়? তিনি আরো কঠোরভাবে কথাটি বললেন, এমনকি তিনি বললেনঃ লোকেরা যেন অবশ্যি তা থেকে বিরত থাকে। অন্যথায় তাদের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেয়া হতে পারে। -[সহীহ বুখারী]

নামাযীর প্রতি আল্লাহর রহমতের দৃষ্টিঃ হযরত আবু যর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : নামাযের সময় আল্লাহ তা’য়ালা বান্দার প্রতি সর্বক্ষণ (রহমতের) দৃষ্টি রাখেন যতক্ষণ নামাজী অন্য দিকে দৃষ্টি না দেয়। যখন সে অন্য দিকে চেহারা ফেরায়, তখন আল্লাহ তা’য়ালা তার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন। – [মুসনাদে আহমাদঃ হাদীস নং ২১৫০৮]

সালাতে আল্লাহর সাথে বান্দা একান্তে কথা বলেঃ হযরত আবূ হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদর কেউ যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন সে আল্লাহর সঙ্গে একান্তে কথা বলে, যতক্ষণ সে তার নামাযের স্থানে থাকে। -{সহীহ বুখারীঃ হাদিস নং- ৪২৬}

সালাত আল্লাহর নৈকট্য ও উচ্চ-মর্যাদা লাভের ওয়াসীলাঃ সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -কে এমন আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন যা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন, তুমি বেশি করে আল্লাহর জন্য সেজদা-সালাত আদায় করতে থাক, কারণ তোমার প্রতিটি সেজদার কারণে আল্লাহ তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং তোমার গুনাহ মাপ করবেন। -(সহীহ মুসলিমঃ হাদীস নং ৭৩৫ )

ফিরিস্তাগণ সালাত আদায়কারীর জন্য দু’আ করতে থাকেনঃ হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যতক্ষণ পর্যন্ত নামাযে থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত ফিরিস্তাগণ এ বলে দু’আ করতে থাকে, হে আল্লাহ্‌! তাঁকে ক্ষমা করে দিন; হে আল্লাহ্‌! তার প্রতি রহম করুন; (এ দু’আ চলতে থাকবে) যতক্ষন পর্যন্ত লোকটি সালাত ছেড়ে না দাড়াবে অথবা তার উযু ভঙ্গ না হবে।” -[সহীহ বুখারীঃ হাদীস নং ৩০০২]

দ্বীনের সর্বোত্তম কাজ হলো সালাত আদায় করাঃ হযরত আবূ উমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা দ্বীনের উপর স্থির থাকো। তোমরা দ্বীনের উপর অবিচল থাকলে তা কল্যাণকর। তোমাদের কার্যাবলীর মধ্যে সর্বোত্তম কাজ হলো সালাত আদায় করা। মুমিন ব্যাক্তিই যত্ন সহকারে উযূ করে। -[ইবনে মাজাহ]

একই বিষয়েঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর নবী, কোন কাজটি জান্নাতের অতি নিকটবর্তী করে দেয়? তিনি বললেন, সময় মত নামাজ পড়া। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর নবী, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর নবী, তারপর কোনটি। তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। -[মুসলিম শরিফঃ হাদিস নং-১৬১]

সালাতের জন্য উত্তমভাবে উযু করাঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের পিছনে রয়ে গেলেন। পরে তিনি আমাদের কাছে পৌছলেন, এদিকে আমরা (আছরের) সালাত আদায় করতে দেরী করে ফেলেছিলাম এবং উযু করছিলাম। আমরা আমাদের পা কোনমতে পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিচ্ছিলাম। তিনি উচ্চস্বরে বললেন: পায়ের গোড়ালিগুলোর (শুষ্কতার) জন্য জাহান্নামের শাস্তি রয়েছে। তিনি দুইবার বা তিনবার এ কথা বললেন। – (সহীহ বুখারীঃ হাদিস নং ৫৮)

হযরত উকবা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত। আমাদের উপর দায়িত্ব ছিল উট চরাবার। যখন আমার পালা আসল তখন আমি এক বিকালে সেগুলো ছেড়ে আসলাম। তখন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলাম যে তিনি মানুষদের নিয়ে কথা বলছেন, তখন তার যে কথা আমি ধারণ করতে পেরেছি তার মধ্যে ছিল, “তোমাদের যে কেউ ওযু করল, আর সে তার ওযু সুন্দর করে সম্পন্ন করে, তারপর দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল অজুর দুই রাকাত সালাত ভালোভাবে আদায় করল, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। -[মুসলিমঃ হাদিস নং ১৪৪]

সালাতে কাতার মিলালে আল্লাহ তাদেরকে নিজ রহমতের সাথে মিলাবেনঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “নামাযের জন্য সারিবদ্ধ হও, কাঁধ মিলাও, ফাঁকা বন্ধ কর, নিজের ভাইদের হাতের প্রতি কোমল হও এবং শয়তানের জন্য ফাঁক রেখোনা। যে ব্যক্তি কাতার মিলায় আল্লাহ তাকে নিজের রহমতের সাথে মিলাবেন। আর যে ব্যক্তি কাতার মিলায় না; আল্লাহ তাকে নিজের রহমত থেকে মিলাবেন-না।” -[আবু দাঊদ]

হযরত আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : তোমাদের সালাতের কাতারগুলো সোজা ও সমান্তরাল কর। কেননা, কাতার সোজা করা সালাত পূর্ণাঙ্গরূপে আদায় করার অন্তর্ভুক্ত। – (বুখারীঃ ৭৩৩ ও মুসলিমঃ ৪৩৩)

হযরত জাবির বিন সামুরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের কাছে এসে বলেলেন:- ফেরেশতা মন্ডলী যেমন তাদের প্রভুর সামনে কাতারবদ্ধ হয় তোমরা কি তেমন কাতারবদ্ধ হবে না ? আমরা জিজ্ঞাসা করলাম: হে আল্লাহর রাসুল ! ফেরেশতা মন্ডলী তাদের প্রভুর সামনে কিভাবে কাতারবদ্ধ হয় ? তিনি বললেন: তারা আগের কাতারগুলো পূর্ণ করে এবং মাঝখানে ফাঁক না রেখে মিলিতভাবে দাড়ায় । – [মুসলিমঃ হাদীস নং ৪৩০]

হযরত আনাস ইবন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কাতারের মধ্যে পরস্পর মিলেমিশে দাঁড়াও, এক কাতার অপর কাতারের কাছে কর এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াও। যার হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ আমি শয়তানকে নামাজের কাতারের মধ্যে বকরির ন্যায় প্রবেশ করতে দেখেছি। – [আবু দাউদঃ হাদীস নং ৬৬৭]

সালাতের কাতারের ফাঁকা জায়গা পূরণের ফজিলতঃ হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি সালাতের কাতারের ফাঁকা জায়গা পূরণ করলো, এর দরূন আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন এবং তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন’’। -[তাবারানী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন]

ফজরের সালাত শয়তানের সব ষড়যন্ত্র নস্যাত করে দেয়ঃ হযরত আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যখন তোমাদের কেউ নিদ্রা যায় তখন তার গ্রীবাদেশে শয়তান তিনটি করে গাঁট বেঁধে দেয়; প্রত্যেক গাঁটে সে এই বলে মন্ত্র পড়ে যে, ‘তোমার সামনে রয়েছে দীর্ঘ রাত, অতএব তুমি ঘুমাও।’ অতঃপর যদি সে জেগে উঠে আল্লাহর যিকির করে, তাহলে একটি গাঁট খুলে যায়। তারপর যদি ওযু করে, তবে তার আর একটি গাঁট খুলে যায়। তারপর যদি নামায পড়ে, তাহলে সমস্ত গাঁট খুলে যায়। আর তার প্রভাত হয় স্ফূর্তি ও ভালো মনে। নচেৎ সে সকালে ওঠে কলুষিত মনে ও অলসতা নিয়ে।”-[ বুখারীঃ ১১৪২, ৩২৬৯, মুসলিম]

সালাতের জন্য জামায়াত কায়েম করা অপরিহার্যঃ হযরত আবু দারদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে এলাকায় বা জনবসতিতে তিনজন লোকও অবস্থান করে, অথচ তাঁরা জামায়াত কায়েম না করে নামায পড়ে, তাদের উপর শয়তান সওয়ার হয়ে যায়। কাজেই জামায়াতে নামায পড়া তোমাদের জন্য অপরিহার্য। কারণ (একা নামায পড়লে তার অবস্থা হবে এমন) যেমন দলছুট বকরীকেই বাঘে ধরে খায়। – (আবু দাঊদ)

সালাত কায়েমের জন্য পদচারণার ফজিলতঃ হযরত ইয়াযীদ ইবনে আবি মারয়াম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একদিন পায়ে হেঁটে জুম’আর জন্য যাচ্ছিলাম। এমন সময় আমার সাথে আবায়া ইবনে রিফায়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ কর! তোমার এই পদচারণা আল্লাহর পথেই। আমি আবু আবস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির পদদ্বয় আল্লাহর পথে ধূলিময় হলো, তার পদদ্বয় জাহান্নামের জন্য হারাম করা হলো। -{ তিরমিযিঃ ১৬৩৮ ও বুখারীঃ ৯০৭}

একই বিষয়ঃ হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নিজের ঘর থেকে পবিত্রতা অর্জন করে আল্লাহর ঘরের (মসজিদের) দিকে যায়, আল্লাহর ফরযের মধ্য থেকে একটি ফরয (নামায) আদায় করার উদ্দেশ্যে; তার এক পদক্ষেপে একটি গুনাহ কমতে থাকে এবং অন্য পদক্ষেপে তার এক ধাপ মর্যাদা বাড়তে থাকে।”- [মুসলিম]

সালাত কায়েম করা ইসলামী বাইয়াতের বিষয়বস্তুর অন্তর্ভূক্তঃ হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নামায কায়েম, যাকাত আদায়, সমগ্র মুসলমানদের জন্য শুভ কামনা ও সঠিক উপদেশ দানের বাইয়াত গ্রহণ করেছি।” -(বুখারী ও মুসলিম)

ফরজ ছাড়াও প্রতিদিন ১২ রাকাত সুন্নাত সালাত আদায়ের ফজিলতঃ হযরত উম্মে হাবীবা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি : ‘‘যে মুসলিম ব্যক্তিই ফরযের অতিরিক্ত প্রতিদিন ১২ রাকাত সুন্নাত সালাত আল্লাহর জন্য আদায় করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের মধ্যে একটি ঘর নির্মাণ করবেন’’। -[মুসলিম]

Share.

About Author

Leave A Reply